সংস্কার উদ্যোগে চাপের মুখে স্লোভেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: স্লোভেনিয়ায় জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী ইয়ানেজ ইয়ানশা দায়িত্ব নেওয়ার চার মাসের মাথায় একাধিক গণভোটের মাধ্যমে তার সংস্কার উদ্যোগের প্রতি জনসমর্থনের পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। বিরোধীরা এসব সংস্কারকে ‘কর্তৃত্ববাদী ’ আখ্যা দিয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী রবার্ট গোলব মার্চের সংসদ নির্বাচনে সামান্য ব্যবধানে জয় পেলেও সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হওয়ার পর ক্ষমতায় আসেন রাজনৈতিক অঙ্গনের অভিজ্ঞ ইয়ানেজ ইয়ানশা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একজন অনুরাগী।
লুবলিয়ানা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
‘কম খরচের রাষ্ট্র, তবে উন্নত মানের সেবা’—এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইয়ানশা সরকারি খাতে চাকরি কমানো এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর অর্থায়ন কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। এসব উদ্যোগ নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা রয়েছে।
ইয়ানশা এরই মধ্যে তিনবার স্লোভেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সর্বশেষ মেয়াদে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তার প্রায়ই বিরোধ হয়েছে। ওই সময়ে তার সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক বিক্ষোভও হয়েছিল।
সমালোচকেরা ইয়ানশার বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, বিচারব্যবস্থাকে আক্রমণ এবং আইনের শাসন দুর্বল করার অভিযোগ এনেছেন।
রোববারের গণভোটের মধ্যে একটি হবে সংসদীয় তদন্ত কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে বাধ্যতামূলক গণভোট।
ভোটাররা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান না করলে তদন্ত কমিশনের তলব করা ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিকভাবে সাক্ষ্য দিতে হবে। কমিশনের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা এই তলবের বিরুদ্ধে আপিলও করতে পারবেন না।
বিরোধীরা বলছে, সাক্ষ্য দিতে তলব করা ব্যক্তিদের সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশে বাধ্য করা হতে পারে। তারা এই আইনকে ‘রাজনৈতিক পুলিশ’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
সরকার আরও তিনটি অ-বাধ্যতামূলক গণভোটের আয়োজন করেছে। এসব বিষয় সরকারের সমর্থকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এর একটি হলো সরকারি টেলিভিশনের অর্থায়নে মাসিক বাধ্যতামূলক চাঁদা তুলে দেওয়া। এতে সরকারি টেলিভিশনের অর্থায়নের দায়িত্ব সরকারের ওপর পড়বে।
অন্য দুটি গণভোটের বিষয় হলো, স্লোভেনিয়ার নাগরিক নন এমন বাসিন্দাদের স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়া নিষিদ্ধ করা এবং দীর্ঘদিন ধরে বেকারদের সরকারি স্বেচ্ছাসেবী কাজে যুক্ত থাকার সঙ্গে তাদের জন্য সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি শর্তযুক্ত করা।
বেসরকারি সম্প্রচারমাধ্যম পিওপি টিভি সম্প্রতি প্রকাশিত এক জনমত জরিপে জানিয়েছে, অধিকাংশ নাগরিক সরকারের উদ্যোগগুলোকে সমর্থন করেন। জরিপে ৩৭ শতাংশ সংসদীয় তদন্ত কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। বিপক্ষে মত দিয়েছেন ২৯ শতাংশ।
গোলব সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশটির ২০ লাখ মানুষের জন্য এটি ‘স্লোভেনিয়ার গণতন্ত্র কতটা দৃঢ়, তার প্রকৃত পরীক্ষা।’
গোলব এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বিরোধী দল হিসেবে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার দিকে যাওয়া এসব প্রবণতা জনসমক্ষে যাচাই করতে আমরা সবকিছু করব। এটি সহজ হবে না।’ এ সময় তিনি ভোটারদের ‘উদাসীনতার’ কথাও উল্লেখ করেন।
গণভোটের ফল বৈধ হতে হলে জয়ী প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিতে হবে মোট যোগ্য ভোটারের অন্তত ২০ শতাংশকে।
বিশ্লেষকেরা কম ভোটার উপস্থিতির পূর্বাভাস দিয়েছেন। এতে গণভোটের ফলের বৈধতা নিয়ে সমস্যা হতে পারে।
রাজনৈতিক ভাষ্যকার আলিয়াজ বিটেনস পেংগভ বলেছেন, ইয়ানশার সংস্কারগুলো ‘অত্যন্ত রক্ষণশীল ভাবাদর্শ প্রদর্শনের রাজনীতি।’ তার মতে, এসব নীতিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতির পাশাপাশি ব্রিটেনের নাইজেল ফারাজ ও ফ্রান্সের মারিন ল্য পেনের প্রচারিত ধারণার সঙ্গে মিল রয়েছে।
বিটেনস পেংগভ এএফপিকে বলেন, ‘এটি কল্পনাশক্তিহীন উগ্র ডানপন্থী রাজনীতি।’
ইয়ানশা সরকারি খাতে চাকরি কমানোরও অঙ্গীকার করেছেন। বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভর না করে সরকারি খাতের কয়েক হাজার কর্মীকে বেসরকারি খাতে স্থানান্তর করাই তার লক্ষ্য।
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সরকার উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের কর ও সামাজিক নিরাপত্তা চাঁদা কমিয়ে আইন পাস করে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার কিছু অংশে বেসরকারি উদ্যোগের সুযোগ বাড়ানো হয় এবং পেনশন না হারিয়ে অবসরপ্রাপ্তদের আবার কাজে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়।
সরকারি খাতের শ্রমিক ইউনিয়নগুলো ৪০ হাজার স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছে। এর মাধ্যমে সরকারের প্রস্তাবিত ‘ইন্টারভেনশন ল ফর স্লোভেনিয়াস ডেভেলপমেন্ট’ বা স্লোভেনিয়ার উন্নয়নের জন্য হস্তক্ষেপ আইন নিয়ে নভেম্বর মাসে বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের পথ তৈরি হয়েছে।
বিটেনস পেংগভ বলেন, সপ্তাহের শেষে গণভোটগুলো ‘প্রাথমিক লড়াই’। বড় লড়াই হবে ওই হস্তক্ষেপ আইন নিয়ে।
নভেম্বরে স্থানীয় নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। এটিও সরকারের জন্য আরেকটি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।