৩১ কোটি পাঠ্যবই : প্রধানমন্ত্রীর তদারকিতে বছর শুরুর আগেই নতুন বই হাতে পাবে শিক্ষার্থীরা

08 October 2026, 02:18 AM
৩১ কোটি পাঠ্যবই : প্রধানমন্ত্রীর তদারকিতে বছর শুরুর আগেই নতুন বই হাতে পাবে শিক্ষার্থীরা
এআই দ্বারা নির্মিত প্রতীকী ছবি

আহসান হাবিব বরুন: একটি জাতির মেরুদণ্ড গড়ে ওঠে তার শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ভর করে। আর সেই শিক্ষার প্রথম ও সবচেয়ে মৌলিক হাতিয়ার হলো পাঠ্যপুস্তক। বছরের প্রথম দিনে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বইয়ের গন্ধ পৌঁছানো কেবল কোনো দাপ্তরিক কাজ নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার মহোৎসব। তবে অতীতে আমরা দেখেছি—সময়মতো বই সরবরাহে ব্যর্থতা, নিম্নমানের কাগজ, মুদ্রণ সংক্রান্ত নানা জটিলতা এবং সর্বোপরি পাঠ্যবইয়ে ইচ্ছাকৃত ইতিহাস বিকৃতি ও রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের মতো বিষাদময় অধ্যায়। সেই কলঙ্কিত ইতিহাসকে পেছনে ফেলে এক নতুন ভোরের ইঙ্গিত দিচ্ছে বাংলাদেশের শিক্ষা খাত। আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষকে কেন্দ্র করে সরকারের বিশাল কর্মযজ্ঞ এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তদারকি নির্দেশ করছে—শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, নির্মোহ ও সময়োপযোগী করার এক সুদৃঢ় অঙ্গীকার।


জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক ও কারিগরি স্তর পর্যন্ত মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই মুদ্রণের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এতে অনুমিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১,৬৪৩ কোটি টাকা। কিন্তু কেবল এই বিরাট অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত পরিসংখ্যান দিয়ে বিষয়টিকে মূল্যায়ন করলে ভুল হবে; এই পদক্ষেপের আসল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে এর প্রশাসনিক দক্ষতা, সময়ানুবর্তিতা এবং রাজনৈতিক নির্মোহতার ভেতরে।


শিক্ষায় বৈচিত্র্য ও বাস্তবমুখী দক্ষতার বিকাশ ঘটাতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যসূচিতে বেশ কিছু প্রশংসনীয় উদ্ভাবন আনা হচ্ছে। এনসিটিবি সূত্রে জানা যায়, নির্ধারিত ১৩৭টি বইয়ের মধ্যে ১৩৩টির পরিমার্জন ও ইনডিজাইন ইতোমধ্যে শেষ করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘খেলাধুলা’, ‘আমাদের সংস্কৃতি’, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ এবং ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’—এই চারটি সম্পূর্ণ নতুন বিষয় প্রথমবারের মতো যুক্ত হতে যাচ্ছে।


এই পরিবর্তনগুলো কেবল নামমাত্র নয়, বরং একটি সমন্বিত শিক্ষানীতির প্রতীক। বর্তমান বিশ্বে মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পরিবেশে শেখার সুযোগ করে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমাদের সংস্কৃতি’ শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও দেশীয় ঐতিহ্যের শিকড়ে ফেরা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই কর্মমুখী শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তুলবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) বিশেষজ্ঞদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এসব পরিমার্জন পরিচালিত হওয়া নিঃসন্দেহে মানসম্পন্ন শিক্ষার প্রাথমিক জামিনদার।


পাঠ্যপুস্তক কলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি হলো এর বিষয়বস্তুর বিশ্বাসযোগ্যতা। অতীতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস বিকৃত করার এক অনাকাঙ্ক্ষিত সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। রাজনৈতিক স্বার্থে কাউকে আকাশে তোলা বা কারও অতুলনীয় অবদানকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা দেশের নতুন প্রজন্মকে ভুল ও বিভ্রান্তিকর শিক্ষা দিয়ে এসেছে।


সহযোগী একটি দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী এনসিটিবি চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা যে দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন, তা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একটি নির্মোহ ও সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে, তা নজিরবিহীন। কোনো রাজনৈতিক চাপ ছাড়া, ইতিহাসকে নির্মোহ আলোয় দেখা এবং যার যতটুকু পাওনা তাকে ততটুকু সম্মান দেওয়া—এটিই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের লক্ষণ।


বিশেষভাবে, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার ঐতিহাসিক সত্যতা, যা একসময় মুছে ফেলার অপপ্রয়াস চালানো হয়েছিল, তা যথাযথ মর্যাদায় পরিমার্জিত পাঠ্যবইয়ে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। ইতিহাসকে বিকৃতিমুক্ত করার এই প্রয়াস তরুণ প্রজন্মকে সঠিক দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে।


অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, জানুয়ারি গড়িয়ে ফেব্রুয়ারি-মার্চ এলেও অনেক প্রান্তিক অঞ্চলে শিক্ষার্থীরা সব বই হাতে পেত না। কাগজ সংকট, ছাপাখানার সিন্ডিকেট কিংবা টেন্ডার জটিলতা ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। তবে এবার দৃশ্যপট সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন।


সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর-২০২৫) অনুসরণে সুনির্দিষ্ট ২০৬ থেকে ২২০ দিনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। ৩ জুন লট বিভাজন ও দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে কাজের সূচনা। ২৮ জুন দরপত্র দাখিল ও উন্মুক্তকরণ। ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে মূল্যায়ন এবং ২৭ আগস্টের মধ্যে অনুমোদন। ৩০ আগস্ট কার্যাদেশ প্রদান এবং ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন। ২৯ নভেম্বরের মধ্যে মুদ্রণ ও বাঁধাই শেষ করে মাঠে শতভাগ সরবরাহ।


ইতোমধ্যে এনসিটিবি সচিব শাহ মুহাম্মাদ ফিরোজ আল ফেরদৌসের বক্তব্যে জানা গেছে, পুরো কার্যক্রম নির্ধারিত সময়সূচির চেয়েও অন্তত এক মাস এগিয়ে রয়েছে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় শতভাগ বই পৌঁছে দেওয়ার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই—অর্থাৎ ডিসেম্বরের শুরুতেই—প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী হাতে নতুন বই নিয়ে বাড়ি ফিরবে।


একটি বড় পরিকল্পনা তখনই সফল হয়, যখন সেখানে কঠোর পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহিতা থাকে। এই মেগা প্রকল্পের সফলতার মূলে রয়েছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এবং শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের প্রত্যক্ষ তদারকি। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মুখপাত্র মাহদী আমিনের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি সরাসরি তদারকি করা হচ্ছে। সরকারের এই সর্বোচ্চ পর্যায়ের মনিটরিং ছাপাখানা-সংক্রান্ত সম্ভাব্য দুর্নীতি, সময়ক্ষেপণ ও সিন্ডিকেটের হাত থেকে পুরো প্রক্রিয়াকে মুক্ত রাখছে।


এমনকি মাধ্যমিক ও কারিগরি স্তরের বই মুদ্রণের মান নিয়ন্ত্রণে রাখা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে গত ২১ জুলাই আলাদা পরিদর্শক নিয়োগের দরপত্রও প্রকাশ করেছে এনসিটিবি। মানসম্মত কাগজ ও উন্নত বাঁধাই নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।


ডিসেম্বর মানেই কোমলমতি শিশুদের জন্য পরীক্ষা শেষের ছুটি এবং নতুন ক্লাসে ওঠার আনন্দ। সেই আনন্দের সাথে যদি যুক্ত হয় চকচকে নতুন পাঠ্যবই, তবে শিশুদের পড়াশোনার আগ্রহ বহু গুণ বেড়ে যায়। বছরের শুরুতেই শতভাগ বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া গেলে তারা কোনো মানসিক পিছিয়ে পড়া ছাড়াই প্রথম দিন থেকেই পড়াশোনায় পূর্ণ মনোনিবেশ করতে পারবে।


রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসে সমৃদ্ধ এবং বাস্তবমুখী শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের ৪ কোটি শিক্ষার্থীর হাত ধরে যে নতুন যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। অতীতে শিক্ষা খাতকে ঘিরে জমে থাকা দুর্নীতির কালিমা ও ইতিহাস বিকৃতির সংস্কৃতি মুছে ফেলে এবার যদি এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন রেকর্ড গড়ে বই পৌঁছে দিতে পারে, তবে তা হবে বর্তমান সরকারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রশাসনিক ও সামাজিক সাফল্য।


পরিশেষে বলতে চাই, এই দৃশ্যমান রোডম্যাপ ও তদারকি যেন কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে শতভাগ বাস্তবায়িত হয়। বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলার প্রতিটি প্রান্তিক শিক্ষার্থীর হাতে ডিসেম্বরের প্রথম সূর্যোদয়ের সাথে সাথে পৌঁছে যাক নতুন বইয়ের মেধা ও স্বপ্নের সুবাস। শিক্ষার্থীদের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দের বার্তার কিছুই হতে পারে না।


লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।